Pages

Saturday, December 01, 2012

অন্দরে ক্ষরণ

অন্দরে ক্ষরণ

এক....
২২০ নম্বর কেবিন। চারপাশ নিঝুম। শুধু এক রুমে সজাগ কয়েকজোড়া চোখ। পিন পতন নীরবতা। কোথাও কেউ নেই। রাতটা আজ বড় নির্জন। চোখের পলক পড়েনা কারও। সবাই দেখছে একটা নিথর নীরব মুখ। ঘুমিয়ে আছে মনে হয়। কিন্তু না, ঘুমিয়ে থাকা মুখটি ঘুমিয়ে নেই। চলে যাচ্ছে অনন্ত গভীরে।
এত তাড়াতাড়ি কেউ অনন্তের পথে যাত্রা করে। কী জানি, জানেনা ওরা । শুধু জানে পাখির মতো চঞ্চল মেয়েটি আর কিছুক্ষন পর আরও অনেকের বুকে গভীর কষ্টের বেদনা জাগিয়ে চলে যাবে অজানার দেশে।
অথচ গতকালও এমন সময় সে জেগেছিল। কী যে হলো!

অজান্তে একঝাক উৎকণ্ঠিত মানুষের ভীড় থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয় সূর্য । হাসপাতালের নির্জন বারান্দায়। চোখের কোনে কী যেন পড়েছে। কটকট করছে। বোঝেনি সে। এতটুকুও বোঝেনি। মৌমিতাকে সে অবহেলা করে দূরে ঠেলে না রাখলেও পারত। মাথাটা ঝিমঝিম করে। অজানা আশংকায় সেই সকাল থেকে যে বুকটায় ঢিপঢিপ শুরু হয়েছে তা আর কমেনি। বরং যত সময় গেছে তত বেড়েছে।

কাল গভীর রাতে আনন্দ তাকে মুঠোফোনে জানিয়েছিল মৌমিতার হঠাৎ অসুস্থতার কথা। অবস্থা খারাপ। আরও অনেক কথাই বলেছিল সে, মাথায় কিছুই ঢোকেনি সূর্যের। শুধু তার মনে পড়েছিল, মৌমিতা তার ওপর অভিমান করে মুঠোফোন বন্ধ রেখেছিল, হঠাৎ সব দুষ্টুমিভরা এসএমএস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর সূর্যও যোগাযোগ করেনি সময়াভাবে। ক'দিন থেকে কাজের চাপও ছিল ওর অফিসে। সবে ডিসেম্বর মাসটা এসেছে। কাজের চাপ বেড়েছে। ইয়ার এন্ডিং চলছে। কড়া নির্দেশ বসের। কাজ কর মনোযোগ দিয়ে। সূর্য সে-মতোই করছিল সব। কিন্তু রাতে যখন জানল, তারপর আর বসতেই পারেনি। সারারাত সিগারেট পুড়িয়ে নির্ঘুম জেগে ভোরেই বেরিয়ে পড়েছে একটা ছোট্ট ব্যাগ নিয়ে। ফার্স্ট ট্রিপ বগুড়াগামী গাড়িটায় এসেছে। ঝিমুনি এলেও তা বারবার থমকে গেছে কোন দূর থেকে ভেসে আসা মৌমিতার হাসির গমকে কিংবা কোনও কথা অবিরাম বলে যাওয়ার স্মৃতিভারে।

সূর্যের সঙ্গে মৌমিতার মুঠোফোনেই কথা হতো। প্রথমদিকে প্রায় প্রতিদিন। চারবার, পাঁচবার। পরে দুজনের ব্যাস্ততার কারণে তা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। সূর্য সুযোগ পেলেই টেক্সট মেসেজ পাটাত। অভিমানি মেয়ে মৌমিতার পাল্টা জবাব আসত কবিতার ছন্দে, কবিতায় মাখামাখি অনিন্দ্য সময়। সূর্য দূরে জেগে থাকা দুএকজন মানুষের দিকে উদ্দেশ্যহীন তাকিয়ে ভাবছিল এসব। হঠাৎ কাধে কারও আলতো চাপ পড়ে। কিছুটা নেশায় পাওয়া সূর্য সম্বিৎ ফিরে পায় গম্ভীর কণ্ঠস্বরে।

-ভেতরে আয়। একাকী কী ভাবছিস। জানিসরে মৌমিতার অবস্থা খুউব খারাপ। এইমাত্র ডাক্তার এসেছিল। বলছিল স্ক্যান করা হয়েছে। রিপোর্ট দেখায়। বলে, ওর পুরো মাথায় ব্লাড ছড়িয়ে পড়েছে। পাল্ স চলছে খুব ধীরে। অবস্থা বুঝতে সময় লাগবে।

একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে সূর্যের। বুঝতে পারেনা কী করবে। শুধু ভাবে কিছুদিন আগে দুস্টুমি করে লেখা চিঠিটা যদি না পাঠাত। হয়তো মৌমিতার অনেক আশা করে বসে থাকাটা ব্যর্থ হতো না। অভিমানে ঝরে পড়ত না কান্নারা। আসলে সূর্যের মাঝেমধ্যে কী যে হয়, শুধু শুধু মেয়েটাকে রক্তাক্ত করল। এমন্তা হবে তা কী ও কখনও ভাবতে পেরে ছিল। সূর্য আবার ডুবে যায় স্মৃতির মগ্নতায়। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব একটা ঘর থাকে। মনের ঘর। কেউ কেউ সে ঘরে উকি দেয়। দেখে নেয়। কেউ কেউ শুধু উকি দিয়ে ক্ষান্ত হয় না। ঘরের আগল খুলে দেয়। রুদ্ধ বাতাসকে মুক্তি দেয়। তেমনি সূর্যের জীবনে মৌমিতা এসেছিল ফাগুন ঝরা রাতে। হঠাৎ মুঠোফোনের কলানে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত সূর্যের কাছে মৌমিতা এক মহার্ঘ্য সময়ের নাম। সূর্য মনে মনে ভাবে, কোন এক মন্ত্রবলে অজস্র জনতার ভিরে নিমেষে মৌমিতাকে কথা বলে কাছের একজন ভেবে মনের তুলিতে রঙ ছড়ায়। মৌমিতাকে লেখে প্রথম কবিতা-

কিছু বিমূর্ত সময়ের নান্দিকতা, নগ্ন ঠোঁটের পাঁজর ভেঙে
তোমায় গরিয়ে দেব এক দীর্ঘ সড়ক ----
                                           ভালোলাগার ।

এভাবেই চলে লেখা। পাল্টা লেখা। মৌমিতা ফিরতি মেসেজ লেখে -

তোমার কাছে গেলে বদলে যায় পতভূমি
চিরায়ত সংস্কার দানাবেঁধে হৃদয়ের জানালা চুমি।
তখন সাগরের গহ্বরে চলে বন্দোবস্ত বিলীন হবার
নিঃসঙ্গ ভাসমান তরী ভাসে গাঙে, হয় জয়জয়কার।

-এভাবেই চলছিল।

আবার ফিরে আসে আনন্দ। হাতে একটা কী যেন। আধো অন্ধকারে দেখা যায় না। আনন্দ কিছু না বলে একটা বাদামি খাম এগিয়ে দেয়।
-কী আছে এতে ?
-চিঠি। ...কি...ছু...চি...ঠি...। কাঁপা গলায় বলে আনন্দ। মৌমিতার লেখা। তোকে নিয়ে লেখা।
-আমাকে নিয়ে! কৈ কখনও তো বলেনি।
-কি জানি, কেন বলেনি জানি না। অসুস্থ হবার পর একবার জেগে উঠে আমাকে বাসায় পাঠিয়েছিল। এটা আনতে।
-কখন ?
-বিকালে। তুই যখন ওর দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলি, তখন।
-আমাকে কেন তবে দিল না ?
-তুই যদি কষ্ট পাস। ও তো তোর চোখ দুটোয় বর্ষা দেখতে পেয়েছিল। তাই আমাকে ইশারায় দেখিয়েছিল। বোঝাল এটা তোর জন্য। আবার নিস্তব্ধতা চারপাশে।
-আনন্দ চলে গেলে হাসপাতালের নির্জন করিডরের শেষ সীমানায় দাড়িয়ে মৃদু আলোয় খামটা ধীরে কাঁপা হাতে খোলে। সফেদ কাগজে কালোকালির গোটা গোটা অক্ষর জেগে ওঠে ডুবোচরের মতো।
-সম্মোহনী শক্তিতে ভর করে একে একে পড়তে থাকে সম্বোধনহীন চিঠিগুলি।


দুই...

আজ আমার সত্যিই দুর্দিন। নিজেকে সামলাতে পারছি না। ভেবেছি এত্ত অবহেলা। সপ্তাহখানেক অন্তত আড়ি। নো যোগাযোগ। কেনো, আপনি লিখলেন 'তোমায় দেখতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু ভয় পাচ্ছি খুব। দূর থেকে তোমাকে ভাবি, সেটাই ভালো। দেখা হলে এই আবেগ মরে যাবে! তাই দেখা না হলে ভালো। আমি পালাবো কাল।'
আপনার এ কথা শুনে আমার অজান্তেই মনের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা মনটা জানান দিল, যে পালাতে চায় অনুক্ষন তাকে কেনই বা আটকে রাখা ? আচ্ছা বলুন তো এমন করে কোনও মানবী কী কোনও মানবকে বেঁধে রাখতে পারে, না বেঁধে রাখতে পারা যায় ? কেউ তো কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। যদিও বা মানুষে মানুষে সামাজিক বন্ধন থাকে কিন্তু তা কখনই সম্পত্তির অধীকারিত্বে আসে না। আপনাকে আজ পর্যন্ত যে সম্বধনে লিখেছিলাম তা আজ থেকে খারিজ হয়ে গেল। এমন দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে আপনাকে একটা কবিতা লিখলাম। জানিনা এটা কবিতা হলো কি না। পড়ে দেখবেন। এ আমার নিজস্ব অনুভব।

''চারিদিকে অহেতুক কোলাহল
থেমে যাবে ঊদাসী কল্পনারা
    বরংবার অতীত পানে

স্পর্শগুলো মরীচীকা হয়ে মিলিয়ে যাবে অনন্তে

শুধু তখন কিংখাব মোড়া অধরা সময়টা ধরা দেবে না
আমাদের সৃজন করা সম্পর্কের আঙিনায়

এভাবেই শেষ হবে শত অযুত মুহূর্ত গুলো
    যমুনার ভাসান চরে

ভাববনা তোমায়
    আঁকবনা কোনও ছবি দিগন্তে
শুধু অগনিত মুখের দিকে তাকিয়ে খুজব
    তোমার মায়াভরা চোখ
    পাগল করা হাসির রিনিঝিনি ঝঙ্কার

আর এমনি করেই দু'চোখের জমিন বেয়ে নামবে অঝোর বর্ষন
রক্তাক্ত মনের আকাশে ঘনঘটার মহড়ায় বাজবে বেদনার মাদল''


তিন...

হঠাৎ নিস্তব্ধতাকে ভেঙেচুরে একটা আর্তনাদের নদী জেগে ওঠে। চলে উত্তালতা। দূরে কোনও সঙ্গী ছাড়া পাখির বিরহগাথা ঝরে পড়ে  ডানার ঝাপটায়। বিমুগ্ধ বিমূড় সূর্য দ্রুতপায়ে এগিয়ে যায় ২২০ নম্বর কেবিনে। সেখানে একজন মায়ার ছোয়ায় সবাইকে ভাসিয়ে রেখে চলে গেছে অনন্তে। সূর্য কিছু বোঝে না। শুধু বুঝতে পারে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে তার পা দুটি কে যেন গেঁথে দিয়েছে ক্রুস দিয়ে। তার চোখ জোড়া এই সফেদ চাদরে ঢাকা মুখটাকে দেখতে চাইছে কিন্তু পারছে না। কারণ চোখ দুটো পাথর হয়ে গেছে। শুধু সূর্য বোঝে হৃদয়ের কোনও এক গহীন থেকে গহীনতর অন্দরে ক্ষরণ হয়। এ ক্ষরণের কোনও নাম জানা নেই তার। হৃদয়টাই সহসা জেগে ওঠে নীরবে ..................

                                                                                                                                                            ছায়াফেরী........

Kono Din Jodi Prem Fire Cau (A Melody By Tapan Choudhury)

Kono din kono din
Jodi prem fire cau
Adharer poth venge
Surjodoye fire esho
Ajo ki jenecho
Ajo ki jenecho
Baul mon amar chilo
Kokhono to sathi chilo na
Kono din vabi ni jorabe e jibon
Khoniker ai badhon
Kadabe amay bujhini
Ajo tai nishi din
Ajo tai nishi din
Valobashar betha nea
Ekraata sathi hoye roy
Kono din jodi cau
Adharer poth venge
Surjodoy e fire esho
Keno je elo melo
Kache asha hoyechilo dujonar
Khoniker e badhaon
Kadabe amay bujhini

Kono din kono din
Dukher ki ai chaua chilo
Vulere adhar buke nea
Valobeshe dure thaka